এক উঠানে ৯ লা/শ, মোংলায় শোকের মাতম আনন্দের বিয়ের ঘর মুহূর্তেই পরিণত হলো শোকের জনপদে।

প্রকাশিত: 13 Mar 2026, 15:30
এক উঠানে ৯ লাশ, মোংলায় শোকের মাতম আনন্দের বিয়ের ঘর মুহূর্তেই পরিণত হলো শোকের জনপদে মোঃ আবু বকর সিদ্দিক , মোংলা (বাগেরহাট): স্বজনদের বুকফাটা কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে মোংলার আকাশ-বাতাস। যে বাড়িতে কয়েকদিন আগেও বিয়ের আনন্দ আর হাসির রোল উঠেছিল, সেই বাড়ির উঠানেই এখন পাশাপাশি রাখা ৯টি লাশ। এক পরিবারের এতগুলো প্রাণ একসঙ্গে নিভে যাওয়ার এই দৃশ্য দেখে চোখের পানি ধরে রাখতে পারছেন না কেউই। মোংলা পৌর শহরের সাত্তার লেনের বাড়িটিতে শুক্রবার (১৩ মার্চ ২০২৬) সকাল থেকেই মানুষের ঢল নেমেছে। আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসা মানুষজন কেউ নিথর দেহগুলোর পাশে বসে বিলাপ করছেন, কেউ আবার নির্বাক দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছেন। কান্নার শব্দে পুরো এলাকাজুড়ে তৈরি হয়েছে শোকের ভারী পরিবেশ। সেই উঠানেই রাখা হয়েছে পৌর বিএনপি নেতা আব্দুর রাজ্জাক, তার ছেলে, মেয়ে, পুত্রবধূ ও নাতি-নাতনিদের মরদেহ। স্বজনদের আর্তনাদে মুহূর্তে মুহূর্তে ভারী হয়ে উঠছে পরিবেশ। অনেকেই বলছেন, এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্য মোংলার মানুষ আগে কখনো দেখেনি। পরিবারের স্বজনরা বলছেন, আনন্দের বিয়ের আয়োজন শেষ করে নববধূকে নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে যে এমন মর্মান্তিক পরিণতি অপেক্ষা করছিল—তা কেউ কল্পনাও করেনি। মুহূর্তেই আনন্দের সেই যাত্রা রূপ নেয় শোকের মিছিলে। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে খুলনা ও বাগেরহাটের রামপাল থেকে নিহতদের মরদেহ এনে রাখা হয় মোংলার সাত্তার লেনের ওই বাড়িতে। আর সেই থেকে বাড়িটির উঠান যেন পরিণত হয়েছে শোকের সমুদ্রে। অন্যদিকে নিহত রাজ্জাকের নব পুত্রবধূ, তার বোন, দাদী ও নানীর মরদেহ রাতেই নিয়ে যাওয়া হয় খুলনার কয়রায়। আর মাইক্রোবাস চালক নাঈমের মরদেহ পৌঁছেছে বাগেরহাটের রামপালের সিঙ্গেরবুনিয়ায়। শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে দুপুর ২টায় মোংলা উপজেলা পরিষদ মাঠে নিহতদের জানাজা নামাজ অনুষ্ঠিত হবে। পরে পৌর কবরস্থানে একে একে তাদের দাফন করা হবে। নিহতরা হলেন— বর আহাদুর রহমান সাব্বির, তার বাবা আব্দুর রাজ্জাক, ভাই আব্দুল্লাহ সানি, বোন উম্মে সুমাইয়া ঐশী, তার ছেলে সামিউল ইসলাম ফাহিম, বড় ভাই আশরাফুল আলম জনির স্ত্রী ফারহানা সিদ্দিকা পুতুল, তাদের ছেলে আলিফ, আরফা ও ইরাম। এ ছাড়া নিহত হয়েছেন কনে মার্জিয়া আক্তার (মিতু), তার ছোট বোন লামিয়া আক্তার, দাদী রাশিদা বেগম, নানী আনোয়ারা বেগম এবং মাইক্রোবাস চালক নাঈম। নিহতদের পরিবারের আবেদনের প্রেক্ষিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করেছে। উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক বাবুল হোসেন রনি বলেন, “রাজ্জাক ভাই আমাদের দলের নিবেদিত মানুষ ছিলেন। ছেলেকে বিয়ে করিয়ে নববধূ নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে একসঙ্গে এতগুলো প্রাণ ঝরে গেল—এটা আমরা কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না। মোংলার ইতিহাসে এমন মর্মান্তিক ঘটনা আগে ঘটেনি।” নিহত রাজ্জাকের ছোট ভাই সাজ্জাদ সর্দার ভেঙে পড়া কণ্ঠে বলেন, “আমার ভাইয়ের পরিবারের ১২ জনের মধ্যে ৯ জনই আজ নেই। ভাবি আর দুই ভাইপো বেঁচে আছে। একজন বাড়িতে আছে, আরেকজন খুলনা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন। কীভাবে এই শোক সহ্য করবো আমরা?” স্থানীয়দের ভাষ্য, একটি পরিবারের আনন্দমুখর বিয়ের আয়োজন মুহূর্তেই পরিণত হয়েছে গভীর শোকে। চোখের সামনে সারি সারি লাশ আর চারদিকে স্বজনদের বুকফাটা কান্না—এই দৃশ্য যেন বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে, এক মুহূর্তের দুর্ঘটনায় কিভাবে একটি পরিবার প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে। মোংলার মানুষ বলছেন, এমন শোকাবহ দৃশ্য তারা আগে কখনো দেখেননি—এক উঠানে ৯টি লাশ, আর চারদিকে শুধু স্বজনদের কান্না। যেন পুরো জনপদটাই আজ এক বিশাল শোকের ঘরে পরিণত হয়েছে।
📘 ফেসবুক ▶️ ইউটিউব