স্বাধীনতার পর এই প্রথম; মন্ত্রীশূন্য নোয়াখালী!

প্রকাশিত: 18 Feb 2026, 13:09
স্বাধীনতার পর এই প্রথম; মন্ত্রীশূন্য নোয়াখালী! রিপোর্ট, জাহিদ হাছান চট্টগ্রাম প্রতিনিধী। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নোয়াখালী জেলার ছয়টি আসনের মধ্যে পাঁচটিতে জয় এনেছে বিএনপি। এরপরও নতুন সরকারের মন্ত্রিসভায় নোয়াখালীর কোনো প্রতিনিধিত্ব না থাকায় রাজনৈতিক অঙ্গনে এক ধরনের নীরব অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। বিজয়ের উচ্ছ্বাস ম্লান করে দিয়েছে মন্ত্রিসভার তালিকা প্রকাশের পরের বাস্তবতা। স্থানীয় নেতা-কর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ সমর্থকদের অনেকেই বিষয়টিকে কেবল পদবঞ্চনা নয়, বরং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবদানের মূল্যায়নের প্রশ্ন হিসেবে দেখছেন। মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) বিকালে নতুন মন্ত্রিসভার শপথের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নোয়াখালী ইস্যুটি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে। দলীয় কর্মীদের পোস্ট, সমর্থকদের মন্তব্য এবং বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষের প্রতিক্রিয়ায় স্পষ্ট হয়—জেলার মানুষের প্রত্যাশা ছিল অন্তত একজন হলেও মন্ত্রিসভায় জায়গা পাবেন। ঐতিহাসিকভাবে নোয়াখালী বিএনপির জন্য একটি শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ১৯৯১ সালের পর একতরফা নির্বাচনের সময়গুলো বাদ দিলে জেলার অধিকাংশ আসনই দলটির দখলে ছিল। এমনকি ২০০৮ সালের ভরাডুবির নির্বাচনে সারা দেশে বিপর্যয়ের মধ্যেও নোয়াখালী থেকে চারটি আসনে জয় আসে। এবারের নির্বাচনে পাঁচটি আসনে বিজয় সেই ধারাবাহিকতাকেই আরও জোরালো করেছে। ফলে স্থানীয় রাজনীতিতে একটি স্বাভাবিক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল—দলের কঠিন সময়ে সক্রিয় থাকা নেতাদের মধ্য থেকে কেউ না কেউ রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আসবেন। নির্বাচনে জয়ী নেতাদের অভিজ্ঞতার দিক থেকেও নোয়াখালী পিছিয়ে ছিল না। নোয়াখালী-২ আসনের জয়নুল আবদিন ফারুক ছয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। বরকতউল্লা বুলু ও মো. শাহজাহান পাঁচবার করে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এম মাহবুব উদ্দিন খোকন দ্বিতীয়বার এবং মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম প্রথমবার নির্বাচিত হয়েছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, আন্দোলন–সংগ্রামে সম্পৃক্ততা এবং সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে তাদের নাম স্থানীয়ভাবে আলোচনায় ছিল। স্বাধীনতার পর প্রায় প্রতিটি সরকারেই নোয়াখালীর প্রতিনিধিত্ব ছিল মন্ত্রিসভায়। বিশেষ করে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সময় ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন জেলার রাজনীতিকে জাতীয় পর্যায়ে শক্ত অবস্থান এনে দিয়েছিল। সেই ইতিহাস থেকেই এবারও একই ধরনের প্রত্যাশা তৈরি হয়। বাংলাভিশনের গুগল নিউজ ফলো করতে ক্লিক করুন তৃণমূলের প্রতিক্রিয়ায় ফুটে উঠেছে আবেগ ও বাস্তবতার মিশ্র সুর। জেলা সদরের ক্রীড়া সংগঠক মো. জহীর উদ্দিন মনে করেন, পাঁচটি আসনে ধানের শীষের বিজয় নোয়াখালীর পরীক্ষিত নেতৃত্বের স্বীকৃতি। তাই মন্ত্রিসভায় অন্তত একজনের অন্তর্ভুক্তি প্রত্যাশিত ছিল। ব্যবসায়ী আশরাফুল এজাজ নতুন মন্ত্রিসভায় নবীন–প্রবীণের সমন্বয়কে ইতিবাচক বললেও জেলার অনুপস্থিতিকে হতাশাজনক বলে মন্তব্য করেছেন। দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতিক্রিয়ায় বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে। জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক নুরুল আমিন খান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, দলকে ধারাবাহিকভাবে আসন উপহার দেওয়া একটি জেলার এমন বঞ্চনা দুঃখজনক। প্রবাসী সাংবাদিক সাহেদ শফিক আন্দোলনের সময়কার ত্যাগের প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকার গঠনের সময় আঞ্চলিক ভারসাম্য, দক্ষতা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা—সবকিছু মিলিয়ে একটি সমন্বিত হিসাব করা হয়। ফলে কোনো জেলার শক্ত নির্বাচনী ফলাফল থাকলেও তা সরাসরি মন্ত্রিসভায় প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে না। তবুও নোয়াখালীর মতো ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি জেলা সম্পূর্ণভাবে বাদ পড়ায় রাজনৈতিক বার্তা কী গেল—সেই প্রশ্ন উঠছে। স্থানীয় উন্নয়ন–ভাবনাও এই আলোচনায় যুক্ত হয়েছে। গণঅধিকার পরিষদের নেতা আব্দুজ জাহের মনে করেন, নোয়াখালী বিভাগ, সিটি করপোরেশন ও বিমানবন্দরসহ বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য মন্ত্রিসভায় জেলার প্রতিনিধিত্ব থাকা প্রয়োজন। তার মতে, বর্ধিত মন্ত্রিসভায় এই শূন্যতা পূরণ হতে পারে। জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মাহবুব আলমগীরের বক্তব্যে তৃণমূলের অনুভূতির প্রতিফলন দেখা যায়। তিনি বলেন, নেতাকর্মীদের ত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি। তবে প্রকাশ্যে ক্ষোভ থাকলেও দলীয় শৃঙ্খলার কারণে কেউই বিষয়টিকে সংঘাতমুখী করতে চান না—এটিও স্পষ্ট।
📘 ফেসবুক ▶️ ইউটিউব